অন্য খবর

কোন সমস্যায় কোন ঘরোয়া প্রতিকার কাজ করে?

গলা ব্যথা, বদহজম, বমি বমি ভাব কিংবা সর্দি-কাশির মতো সাধারণ সমস্যায় অনেকেই ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর ভরসা করেন। মধু, আদা, পুদিনা, হলুদ কিংবা রসুনের মতো পরিচিত উপাদান সাময়িক আরাম দিতে পারে। তবে সব ঘরোয়া উপায়ের কার্যকারিতার পক্ষে সমান বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। কিছু ক্ষেত্রে উপসর্গ কমাতে সাহায্য করলেও এসব উপাদান চিকিৎসার বিকল্প নয়। কোন সমস্যায় কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা জেনে নেওয়া যাক।

১. গলা ব্যথায় মধু ও লেবু

গলা ব্যথা বা খুসখুসে অস্বস্তিতে মধু মেশানো হালকা গরম পানীয় আরাম দিতে পারে। মধু গলার অস্বস্তি প্রশমিত করতে সাহায্য করে। এর সঙ্গে লেবুর রস মেশালে পানীয়টির স্বাদ বাড়ে। তবে লেবু সবার ক্ষেত্রে আরামদায়ক নাও হতে পারে। কারও গলায় জ্বালা বাড়লে লেবুর রস এড়িয়ে চলা ভালো।

এই পানীয় তৈরি করতে এক টেবিল চামচ মধু ও অর্ধেক লেবুর রস এক কাপ হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে ধীরে ধীরে পান করতে পারেন। প্রয়োজন অনুযায়ী দিনে একাধিকবার পান করা যায়। তবে মধুতে থাকা চিনি বিবেচনায় রাখা জরুরি। এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনোভাবেই মধু দেওয়া যাবে না।

মধু গলার অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করলেও এটি ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সারানোর নিশ্চয়তা দেয় না। গলা ব্যথার সঙ্গে শ্বাস নিতে বা গিলতে কষ্ট হলে, কিংবা উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

২. বদহজমে পুদিনা চা

খাবারের পর পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হলে অনেকে পুদিনা চা পান করেন। পুদিনায় থাকা মেন্থল সতেজ অনুভূতি দিতে পারে। তবে বদহজমের সব উপসর্গ কমাতে পুদিনা চায়ের কার্যকারিতার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। পুদিনার কিছু উপাদান পরিপাকতন্ত্রের পেশিতে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে একই রকম ফল পাওয়া যায় না।

পুদিনা চা তৈরি করতে এক কাপ গরম পানিতে কয়েকটি পরিষ্কার পুদিনাপাতা দিয়ে পাঁচ থেকে সাত মিনিট ঢেকে রাখুন। এরপর ছেঁকে পান করুন। খাবারের পর পান করলে কারও কারও অস্বস্তি কমতে পারে।

তবে যাঁদের বুকজ্বালা বা অম্লতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে পুদিনা উপসর্গ বাড়াতে পারে। তাই পুদিনা চা পান করার পর অস্বস্তি বাড়লে তা এড়িয়ে চলুন। বারবার বদহজম হলে শুধু ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর নির্ভর না করে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।

৩. বমি বমি ভাব কমাতে আদা

বমি বমি ভাব কমাতে আদা বহুল ব্যবহৃত একটি ঘরোয়া উপাদান। কিছু গবেষণায় বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় বমি বমি ভাব কমাতে আদার সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে। তবে সব ধরনের বমি বমি ভাব বা বমির ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সমান নয়।

আদার চা তৈরি করতে কয়েক টুকরা তাজা আদা কুচি করে এক কাপ পানিতে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিন। এরপর কিছুটা ঠান্ডা হলে ছেঁকে পান করুন। আদার ঝাঁঝালো স্বাদ কারও কারও কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে। ভ্রমণের সময় কিংবা হালকা বমি বমি ভাবের ক্ষেত্রে এটি চেষ্টা করা যায়।

তবে বেশি আদা খেলে কারও কারও বুকজ্বালা বা পেটের অস্বস্তি হতে পারে। গর্ভাবস্থায় নিয়মিত আদা খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বারবার বমি হলে, পানি ধরে রাখতে না পারলে কিংবা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

৪. গাঁটের ব্যথায় হলুদের দুধ

হলুদে কারকিউমিন নামের একটি উপাদান রয়েছে, যা প্রদাহ কমানোর সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য পরিচিত। এ কারণে গাঁটের ব্যথা বা অস্বস্তি কমাতে হলুদ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। তবে হলুদ মেশানো দুধ পান করলেই গাঁটের ব্যথা সেরে যায়, এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। এটি চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্পও নয়।

হলুদের দুধ তৈরি করতে এক কাপ গরম দুধে এক চা চামচ হলুদ মিশিয়ে নিতে পারেন। চাইলে এক চিমটি গোলমরিচ যোগ করা যায়। তবে গোলমরিচের উপাদান কিছু ওষুধের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে বা কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বেশি পরিমাণে হলুদ বা গোলমরিচ গ্রহণ করা উচিত নয়।

ঘুমানোর আগে এই পানীয় পান করলে কারও কাছে আরামদায়ক মনে হতে পারে। তবে এটি যে ঘুম গভীর করে বা গাঁটের ব্যথা সারিয়ে চলাফেরার ক্ষমতা বাড়ায়, তা নিশ্চিত নয়। ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে, গাঁট ফুলে গেলে কিংবা নড়াচড়ায় সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

৫. সর্দি-কাশিতে রসুন

রসুন রান্নার পরিচিত উপাদান। এতে থাকা কিছু যৌগের জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে রসুন খেলে সর্দি-কাশি দ্রুত সেরে যায় বা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যায়, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

রসুন কুচি করে স্যুপ বা অন্যান্য রান্নায় যোগ করে খাওয়া যায়। এতে খাবারের স্বাদ বাড়ে এবং খাদ্যতালিকায় রসুন রাখা সহজ হয়। তবে কাঁচা রসুন গিলে খাওয়াকে সর্দি-কাশির চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। কাঁচা রসুনে কারও কারও পেটে জ্বালা, অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হতে পারে।

সর্দি-কাশি হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি পান এবং উপসর্গ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বর কিংবা অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৬. বুকজ্বালায় বেকিং সোডা

বেকিং সোডা বা সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ক্ষারধর্মী পদার্থ। এটি পাকস্থলীর অ্যাসিড সাময়িকভাবে প্রশমিত করতে পারে। এ কারণে কিছু অ্যান্টাসিডে এই উপাদান ব্যবহার করা হয়। তবে রান্নায় ব্যবহৃত বেকিং সোডা আন্দাজ করে পানিতে মিশিয়ে খাওয়া নিরাপদ নয়।

বেকিং সোডায় সোডিয়াম বেশি থাকে। অতিরিক্ত গ্রহণে শরীরের অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে এবং সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং নির্দিষ্ট ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বুকজ্বালা কমাতে এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ বেকিং সোডা মিশিয়ে পান করার পরামর্শ দেওয়া যায় না।

মাঝেমধ্যে বুকজ্বালা হলে ঝাল ও চর্বিযুক্ত খাবার কমানো, একবারে অতিরিক্ত না খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ার মতো অভ্যাস উপকার দিতে পারে। বুকজ্বালা ঘন ঘন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বুকের ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঘাম বা হাত-চোয়ালে ব্যথা হলে সেটিকে সাধারণ বুকজ্বালা ভেবে অবহেলা না করে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারে সতর্কতা

মধু, পুদিনা, আদা, হলুদ কিংবা রসুনের মতো উপাদান কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক আরাম দিতে পারে। কিন্তু প্রাকৃতিক উপাদান মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। কারও অ্যালার্জি থাকতে পারে, আবার কিছু উপাদান ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া করতে পারে। উপসর্গ তীব্র হলে, দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা বারবার ফিরে এলে ঘরোয়া প্রতিকারের বদলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

সম্পর্কিত খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button